সংস্কৃতি- আচারে মননে

Updated: Feb 6, 2020

এইতো সেদিন বিকেল পাঁচটা । ডালহৌসি পাড়ায় দাঁড়িয়ে আছি বাসের অপেক্ষায়। অফিস ফেরত জনতার ঢল নামে, সেটা সবে শুরু হয়েছে। হঠাৎই একটা ধাক্কা, পরমুহুর্তেই চমকে তাকানো। আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই অভিভূত ।"তুই এখানে"।" আরে তুই"। ব্যাপারটা হল বহুদিনের পুরনো এক বন্ধুর সঙ্গে হঠাৎ দেখা।


এরপর কি হবে। যথারীতি বন্ধুর অনুরোধ "চল কোথাও একটু বসি"। জমিয়ে আড্ডা দেওয়া যাক। দেখা গেল এখন তার বিশেষ কাজ নেই। কিন্তু আমার যে জরুরী কাজ রয়েছে- রিহার্সাল। আমতা আমতা করে সে কথা বলতেই বন্ধু এক নিমিষে আমার রিহার্সাল যাওয়া বাতিল করে দিল। বলল ওটা আবার কাজ না কি? চল চল রেলা দিস না।


অগত্যা সেদিনের রিহার্সাল মাটি হল এবং বিনা কারণে। অনেককে আসতে বলেছিলাম, তাদের সত্যি সত্যি কাজ ছিল। তারা এসেছিল এবং ব্যর্থ হয়ে ফিরে গিয়েছিল। পরে দেখা হতে মিথ্যে বলেছিলাম। ওরা বিশ্বাস করেছিল।


সেদিন কথায় কথায় নীলার সঙ্গে তো আমার ঝগড়াই হয়ে গেল। নীলা হচ্ছে নীলা সরকার। খুব প্রগতিশীল কথাবার্তা বলে, ঝকঝকে চেহারা, নাটক করে, গণসংগীত গায়। আমায় বলে " এসব বেগার খাটা কেন? ধান্দা করো তো"। আমি বলি 'কিসের ধান্দা?'। ওর চটপট উত্তর 'পয়সার ধান্দা '। দেখো সংস্কৃতি এখন একটা সঙ্ঘবদ্ধ শিল্প। তা শিল্পের নিয়মটা কি- বিনিয়োগ, উৎপাদন, মুনাফা। তুমি বিনিয়োগ করছো তোমার মেধা, তোমার চিন্তা, উৎপাদিত হচ্ছে সাংস্কৃতিক ফসল। কিন্তু মুনাফা পাচ্ছ না, এটা চলতে পারে না। আমি তো ঠিক করে নিয়েছি পয়সা ছাড়া আর কোন কাজ নয় । এসব করে কিছু হবে না, দাদাদের দিদিদের দেখলাম তো, সব আখের গোছানোর তালে ব্যস্ত। মুখে বড় বড় বুলি এই করেছি সেই করেছি , ত্যাগ স্বীকার করেছি, আদর্শের প্রতি অবিচল থেকেছি, আর কাজে দেখ তাদের বাড়ি তৈরি হছে, ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স বাড়ছে , স্ট্যাটাস বাড়ছে , আর এসব হচ্ছে তোমার আমার মত কিছু মূর্খের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে। আমি এতক্ষণ চুপ করে ছিলাম, একদমে কথাগুলো বলে নীলা হাপাচ্ছে। ওর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। শেষ বিকেলের রোদে তা চকচক করছে । বড় রাস্তায় ততক্ষণে একটা জ্যামের সৃষ্টি হয়েছে। নজর করে দেখি একটা মিছিল। অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে সোচ্চার যুবক যুবতীর গগনবিদারী হুঙ্কার।


দুর হটো... দুর হটো... হঠাৎই চোখ আটকে গেল পরিচিত এক দাদাকে মিছিলে দেখে। আর মনে পড়ে গেল কয়েকদিন আগে সুভাষদা ওই দাদার সম্বন্ধে বলতে বলতে ঝড় ঝড় করে কেঁদে ফেলেছিলেন। সুভাষদা নাটক লেখেন, ঠিক বলা হলো না, লেখার চেষ্টা করেন, বয়স প্রায় পঞ্চাশ। ধুতি আর বাংলা সার্ট ছাড়া সারা জীবন কিছু পড়েননি। মিছিলের ওই দাদা আর সুভাষদা উত্তর চল্লিশের সহ যোদ্ধা। অনেক দিন অনেক রাত ওদের কেটে গেছে সুস্থ সংস্কৃতির প্রচারের চিন্তায়। কালের বিবর্তনে সুভাষদা এখনও সেই রকমই রয়ে গেছেন। আর তার বন্ধু এখন নব্য সংস্কৃতির একজন ধারক ও বাহক।


নীলার কথা মনে পড়ল। বিনিয়োগ উৎপাদন মুনাফা। নীলা ইকনমিক্সটা পড়েছিল, তাই ওর পক্ষে বুঝতে সুবিধে হয়েছে। আমি তো লেখাপড়াটাই ভালো করে শিখিনি, তাই বুঝতে দেরি হলো।


গতকাল রিহার্সালে গিয়েছিলাম। পাড়ায় একটা ক্লাবের বাৎসরিক উৎসব, সেই উপলক্ষে নৃত্যনাট্য। প্রয়োগ প্রধান আমি। গত কুড়ি দিন ধরে প্রায় ৩০-৩২ জন ছেলে মেয়েকে নিয়ে গড়ে তুলেছি জীবন্ত চিত্রকল্প। বিভিন্ন জায়গা থেকে ছেলেমেয়েরা একত্রিত হয়েছে। অনুষ্ঠান শেষ হবে যে যার জায়গায়, যে যার কাজে ফিরে যাবে, পড়ে থাকবে স্মৃতি। গতকালই ছিল শেষ রিহার্সাল। অনেক রাগারাগি হয়েছে বকাবকি চলেছে মান অভিমান নিয়ে নাটকের বাইরে গড়ে উঠেছে আরেক নাটক। কিন্তু গতকাল দেখলাম ওদের মুখ ভার, খুঁজে পেলাম কষ্টের ছায়া, জিজ্ঞাসা করি- কিরে কি হয়েছে? দেখলাম ওরা কথা বলতে পারছে না, ওদের চোখে জল। তখন ওদের কথা শুনে মনটা আনন্দে নেচে উঠল। কোথায় গেল ক্লান্তি ? কোথায় নির্বাসিত অবসাদ? মনে হল এত তাজা এত ঝরঝরে নিজেকে আগে কখনো লাগেনি। ভাবতে ভাল লাগল মোরা যাত্রী একই তরণীর, সহযাত্রী একই তরণীর।


আমার বয়স হয়েছে। আমিও কি ওদের মতো সেন্টিমেন্টাল হয়ে পড়ব? আচ্ছা এটা কি নিছকই সেন্টিমেন্টাল? না, একেবারেই না। এটাই সত্য যে এই অনুভূতি সুস্থ সংস্কৃতির দান। অচেনাকে চেনা আর মানুষে মানুষে হৃদয়ের মেলবন্ধন। সংস্কৃতি চর্চার এই তো নীট লাভ। সেদিন আমি চুপ করে ছিলাম। নীলা... আজ তোমার সঙ্গে দেখা হলে বলব- বিনিয়োগ,উৎপাদন, মুনাফা তত্ত্বটি আমি বুঝতে পেরেছি। বিনিয়োগ আমাদের হৃদয়, উৎপাদন সুস্থ জীবন চর্চার জীবন্ত ক্যানভাস আর মুনাফা আরও ভালোভাবে বাঁচবার অনুপ্রেরণা, প্রাণে প্রাণে মিলিত হবার আকাঙ্খা। " পৃথিবীর গভীর গভীরতর অসুখ এখন"- জীবনানন্দের ওই কথাটা আজ ভীষণভাবে সত্যি মনে হয়। আর সেই কারণেই রোগ মুক্তির চাবিকাঠি ও অনেক গভীরে প্রোথিত।


কালীশঙ্কর ভট্টাচার্য

20 views0 comments
  • download (8)

Copyright © bunonindia. All rights reserved.