আমি একজন মহিলা...এটা কি আমার অপরাধ?

Updated: Aug 26, 2019

ভ্রূণহত্যা


ছিলাম একটি কন্যা ভ্রূণ। তখনও কেউ কিছু জানত না। মায়ের গর্ভবতী হওয়ার খবরে পরিবারে খুশির মেজাজ। কিন্তু সেই আনন্দের মুহূর্ত বিষাদে পরিণত হতে বেশি সময় নেয়নি, যখন জানা গেল ভ্রূণটি কন্যা ভ্রূণ। চিকিৎসা বিজ্ঞানের আধুনিকতাকে ধন্যবাদ! সেই দিন থেকেই নীরবে মায়ের চোখের জল পড়া শুরু। পরিবার চেয়েছিল প্রথম সন্তান হবে পুত্র সন্তান। আমাকে তারা চাইছিল না। বন্ধ দরজার পেছনে গর্ভপাতের বিরুদ্ধে বাবার সাথে মায়ের লড়াই। শেষপর্যন্ত আমার মায়ের ইচ্ছেটাকে দুমড়ে মুচড়ে সমাধি দেওয়া হল। আমাকে হত্যা করা হল। আমার জন্ম নেওয়ার মানবিক অধিকার্টুকুও কেড়ে নেওয়া হল।


শিশুঘাতক


গরিব পরিবার, ফলে জন্মের আগে লিঙ্গ নির্ধারণের বিষয়টা করা হয়ে ওঠেনি। সেই কারণে আমার পরিবার আমাকে পৃথিবীর আলো দেখার অধিকার দিয়েছিল। কিন্তু জন্মের দিন থেকেই পরিবারের বয়স্করা এবং আমার বাবা, আমাকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র শুরু করে দিয়েছিল। স্বল্প আয়ের পরিবারে আমি হয়ে উঠেছিলাম ভবিষ্যতের মাথাব্যাথা। মায়ের সব আকুতি মিনতি ব্যর্থ হয়েছিল। জন্মের ঠিক এক সপ্তাহ পর। গ্রামের একজন দাইমার ওপর আমাকে হত্যার ভার দেওয়া হয়েছিল। গলায় গরম দুধ ঢেলে এক মুঠো ধান মুখের মধ্যে চেপে ধরেছিল। আমার বেঁচে থাকা আর হল না। আর্তনাদ করে মায়ের কান্নার আওয়াজ শুনতে শুনতে আমার পৃথিবী অন্ধকার হয়ে গেল।


ঘাতক লিঙ্গ বৈষম্য


তখন আমি ছয়। আমার ছোট ভাইয়ের বয়স তিন। সংসারে আর্থিক অনটন। অগত্যা ফার্স্ট স্ট্যান্ডার্ড শেষ করার পর আমার স্কুলের পাট চুকে যায়। কারণ, আমি যে কন্যা সন্তান। সকালে মা আর বাবা কাজে বেড়িয়ে যেত। ছোটো ভাইয়ের খেয়াল রাখা, ঘরের কাজকর্মের দ্বায়িত্ব পড়ল আমার ওপর। খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য- সবদিক থেকেই আমি ছিলাম বঞ্চিত, মানিয়ে নেওয়াটাই আমার ভবিতব্য হয়ে গিয়েছিল। অবশেষে অপুষ্টির শিকার, অসুস্থ হয়ে বাড়িতেই পড়ে থাকতে হল। সময় মত চিকিৎসা না পেয়ে বছর সাতেকের মধ্যেই মৃত্যুর কাছে হার মানতে হল।


কৈশোরে যৌন নির্যাতন


সমস্যা যেন পিছুই ছাড়ে না। সেই সময় স্কুলে পড়তাম। পাড়ায় ছোট-বড় নির্বিশেষে সব পুরুষরাই আমাকে বিরক্ত করত। স্কুলে নানা অছিলায় পুরুষ শিক্ষকরা গায়ে হাত বোলাতো, কিছু পুরুষ আত্মীয় গায়ে হাত দিয়ে আদর করত, সেইসব স্পর্শে তাদের স্নেহ ছিল না, ছিল যৌন সন্তুষ্টি। কিন্তু এসব নিয়ে আমি মা-বাবার কাছে কখনো অভিযোগ জানাইনি। কারণ ভয় পেতাম, যদি এসব শুনে আমার বাইরে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়? যদি সব দোষ আমার ওপর এসে পড়ে? মনের ভেতরের অভিব্যাক্তি মুখ পর্যন্ত এসে পৌঁছয়নি।


স্কুলে যাওয়ার পথে ছেলেটা প্রতিদিন বিভিন্নভাবে বিরক্ত করত। একদিন ভালোবাসার প্রস্তাব দেয়, আমি তা প্রত্যাখ্যান করি। পরিস্থিতিটা আমার সহ্যের সীমা অতিক্রম করে গিয়েছিল, সজোরে ওর গালে একটা চড় বসিয়ে দিই। এমনকি পুলিশে যাওয়ারও হুমকি দিই। পরের দিন স্কুলে যাওয়ার পথে আচমকা আমার মুখে অ্যাসিড ছুঁড়ে মারল, কিছু বুঝে উঠতে পারিনি। মুখটা জ্বলে যেতে লাগল, যেন আগুনে পুড়ে যাচ্ছে। মুখে এবং ঘাড়ে প্লাস্টিক সার্জারির প্রয়োজন ছিল। আমার অসহায় মা-বাবা, আর্থিক কারণে সেই খরচ বহন করতে পারেনি।


হঠাৎ করেই জীবনটা অনেকটা পালটে গেল। যে ক্ষত ছিল মনের গভীরে, আজ সেটাই প্রকাশ্যে, দগ্ধ মুখটা দেখে সবাই শিউরে উঠত। জীবনটা যেন থমকে গিয়েছিল। বাড়ির বাইরে বেরোতে মন চাইত না। কারোর সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করত না। আমার ভবিষ্যতের কথা ভেবে মা-বাবাও কষ্ট পেত, কি করবে ভেবে দিশেহারা হয়ে গিয়েছিল। এই পরিস্থিতি আমি আর নিতে পারছিলাম না। আত্মহত্যার পথ বেছে নিলাম। নিজেকে শেষ করে দেওয়াই সঠিক বলে মনে হয়েছিল। জানি আত্মহত্যা করা অপরাধ। কিন্তু এই অপরাধ আমার নয়, আমি তো কেবল শরীরটাকে শেষ করেছি। আমাকে তো অনেকদিন আগেই হত্যা করা হয়েছে। এই অপরাধ তাদের, যারা আমার কাছ থেকে সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকারটাই ছিনিয়ে নিয়েছিল।


কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি


প্রফেশনালি কোয়ালিফায়েড। অবিবাহিত ওয়ার্কিং ওম্যান। ডিসেন্ট স্যালারি পাই। একজন সিনিয়রের কারণে আমার প্রমোশনটা আটকে আছে। লোকটা আমার কাছে যৌন প্রশ্রয় পাওয়ার আশা রাখে, কিন্তু আমি তা বারবার নাকচ করেছি। আর সেই কারণে আমার কেরিয়ারগ্রাফটাও কোথাও যেন থমকে গিয়েছিল। কোনও আশার আলো দেখতে পাচ্ছিলাম না। শেষে এমন পরিস্থিতি হল যে বাধ্য হয়েছিলাম চাকরি ছাড়তে। এখানে আমার অপরাধ কি ছিল?


ধর্ষণ


অবিবাহিত মেয়ে। চাকরি করি। যথেষ্ঠ সাবলম্বী। লেডিজ হস্টেলে থাকি। একটা কল সেন্টারে কাজ করতাম। প্রতিদিন ভোর চারটের সময় ফিরতাম। কাজের শেষে অফিসের গাড়িই ড্রপ করে যেত। আমিই শেষ জন থাকতাম নামার জন্য। একদিন ফেরার সময় ড্রাইভার গাড়ির রুট ঘুরিয়ে দিল। প্রশ্ন করায় কি যেন একটা বলেছিল। খেয়াল নেই। যাওয়ার পথে ড্রাইভারের আরও দুটো বন্ধু গাড়িতে উঠল। মনের মধ্যে একটা সন্দেহ দানা বাঁধল। ফাঁকা রাস্তা। কি করব? কোথায় সাহায্য পাব? আচমকা একটা পার্কে গিয়ে গাড়িটা থেমে গেল। কিছু বোঝার আগেই পার্কের পিছনের ঝোঁপটায় আমাকে টেনে নিয়ে গেল। একের পর এক আমার শরীরটাকে শকুনের মত ঠুকরে খেল। ভোরবেলা পার্কের মধ্যে হাঁটতে আসা কিছু মানুষের কথাবার্তার আওয়াজ শুনে চিৎকার করার চেষ্টা করতে যাচ্ছিলাম। ঠিক তখনই একটা টাওয়েল দিয়ে মাথাটা ঢেকে দিল ওরা। তারপর ভারী একটা পাথর দিয়ে আমার মাথাটা থেঁতলে দিল। আমার মৃত্যুর জন্য আমি দায়ী নই।


পারিবারিক হিংসা


পণের জন্য সকাল বিকাল স্বামীর কাছে অপদস্থ হয়েছি। একদিন বাধ্য হয়ে থানায় অভিযোগ জানানোর হুমকি দিই। ঠিক তার পরের দিন দুপুরে আমার খাবারের সাথে বিষ মিশিয়ে দেওয়া হয়। আমার বাবা-মাকে বলা হয়েছিল ডিহাইড্রেশনের কারণে নাকি আমার মৃত্যু হয়েছে। জীবনটাকেই হারিয়ে ফেললাম আমি।


কোথাও শুনেছিলাম যে বিবাহিত মহিলাদের আত্মহত্যার কারণ মূলত পারিবারিক অশান্তি, মদ্যপ স্বামীর হাতে শারীরিক নিগ্রহ, বিভিন্ন কারণে ব্ল্যাকমেলিং-এর শিকার এবং আর্থিক অনটন। কারণ যাই হোক, পরিণতি যে একটাই আজ তা জানলাম।


প্রসবকালীন মৃত্যু


আমি একজন গরীব গর্ভবতী মহিলা। প্রোটিনযুক্ত খাবার তো দূর অস্ত, পেটভরা খাবারটাও জুটত না। গর্ভাবস্থার পুরো সময়টাই আমি রক্তাল্পতায় ভুগেছি। সরকারি হাসপাতালে ভরতি হলাম। ভরতি হতে অনেকটা দেরীও হয়ে গিয়েছিল। হাসপাতালের অব্যবস্থা। সঠিক পর্যবেক্ষেণের অভাব। ডেলিভারির সময় আমার শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হল। সন্তানের জন্মের পরেই আমার মৃত্যু হল। শুনেছিলাম ভারতে প্রসবকালীন মৃত্যুর হার অন্যান্য দেশের থেকে ৫০ শতাংশ বেশি। আমার মৃত্যুর কারণ ছিল দারিদ্র, আমি কিন্তু প্রত্যক্ষভাবে দায়ী ছিলাম না।


কন্যা ভ্রূণহত্যা, লিঙ্গ বৈষম্য, যৌন নির্যাতন, ধর্ষণ, পারিবারিক হিংসা, প্রসবকালীন মৃত্যু, অ্যাসিড অ্যাটাক, পণের মত ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে মহিলাদের মৃত্যু হতে থাকে; অবশ্যই ভারতে নারী-পুরুষের আনুপাতিক হারের পার্থক্য খুব শীঘ্রই আরও প্রকট হয়ে উঠবে।


পুরুষরা কেন মহিলাদের শুধু একটা প্রয়োজন পূরণের মাধ্যম হিসাবে দেখবে? বয়স, শিক্ষা, বুদ্ধিমত্তা, যোগ্যতা, সমাজের বিভিন্নক্ষেত্রে নারীদের অবদানগুলিকে কেন বিচার করা হবে না?

এই দুঃসময় কবে শেষ হবে। সহ্যের সীমা তো কবেই ছাড়িয়েছে। এই সমাজ, এই দেশ, তার উন্নয়ন সব নিপাত যাক্‌। বেচেঁ থাক মানবিকতা!


সুস্মিতা দে হাজরা

364 views0 comments
  • download (8)

Copyright © bunonindia. All rights reserved.