ভালোবাসার বিভ্রম

Updated: Feb 18

সোহান আর তৈমুর, প্রায় দু'বছর ধরে তাদের মধ্যে সম্পর্ক। সেই সম্পর্ক ছিল ভালবাসার, শ্রদ্ধার। দু'জনে এক ইউনিভার্সিটিতে আছে। একে অপরের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। একসাথে পায়ে পা মিলিয়ে হাঁটতে থাকে। ভালবাসায় মুগ্ধ দুটি হৃদয় হয়তো সুখের থেকেও বেশি কিছু পেয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই সব পালটে গেল।


ফাইনাল সেমিস্টারের পরীক্ষা শেষ। বাবার বিচ হাউসে বন্ধুদের সঙ্গে ছুটি কাটাতে গেল সোহান। শহর থেকে বেশ অনেকটাই দূরে । তৈমুরের মা হাসপাতালে ভর্তি । অগত্যা তৈমুরকে শহরেই থেকে যেতে হল।


বিচ হাউসে পৌঁছতে প্রায় মাঝ রাত হয়ে গেল। পরের দিন সকাল বেলা তারা সকলে বিচে পৌছল। সোহান দেখল বিচের ধারে একজন সুপুরুষ যুবক একাকী বসে আছে । হয়ত কারোর জন্য অপেক্ষায় রয়েছে। সোহান বন্ধুদের বলল, ‘তোরা এনজয় কর, আমি একটু ঘুরে আসছি’।


পার্পেল রঙের টি-শার্ট পরা ছেলেটির পাশে গিয়ে বসল সোহান। তার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হেসে বলল, ‘হ্যালো আমি সোহান’। ‘ হ্যালো আমি তাহসিন’। প্রায় এক ঘন্টা তারা বসে গল্প করল। তাহসিন নিজের সম্পর্কে অনেক কথা সোহানের কাছে বলে ফেলল, প্রায় সবটাই। মনে হচ্ছিল তারা একে অপরের সান্নিধ্য উপভোগ করতে শুরু করেছে।


সোহান আরও কিছুটা সময় তার সঙ্গে কাটাতে চাইছিল। ‘লেটস্ হ্যাভ সাম কফি’, তাহসিনের অফার ফেরাতে পারল না সোহান। দু’জনে কাছেই একটা রেস্টুরেন্টে গেল । গল্প করতে করতে প্রায় দু'ঘণ্টা পার হয়ে গেল। কোনো ভ্রক্ষেপ নেই, একে অপরের সঙ্গে গল্প করে চলল। ‘ সমুদ্র আমার বড় ভালোবাসার, আমি প্রায়ই আসি, তুমিও কি সমুদ্র ভালোবাসো? কোথায় যেন সমুদ্র আমাকে একটা পূর্ণতা দেয়, স্বাধীনতা দেয়’; কফিতে চুমুক দিতে দিতে তাহসিনকে বলল সোহান। এটা তাদের প্রথম সাক্ষাৎ। কিন্তু মনে হচ্ছিল একে অপরকে দীর্ঘদিন ধরে চেনে। দীর্ঘ দিনের পরিচয়। ছুটির বাকি দিনগুলো তাহসিনের সঙ্গেই কাটাতে লাগল সোহান। সময় গড়িয়ে যেতে লাগল। অন্য শহর থেকে আসা তাহসিনকে কখন যেন ভালবেসে ফেলেছে সোহান। ফিরে যাওয়ার সময় সোহান ভেঙ্গে পরলো। হয়ত, এটাই জীবন। ‘আমাকে রেগুলারলি মেসেজ করো’ সোহানকে বলল তাহসিন। ‘পরের গ্রীষ্মে আবার দেখা হবে’, একে অপরকে প্রমিস করল।


সোহান ফিরে এল বিচ হাউসে। তৈমুরের ফোনটা বেজে উঠতেই যেন সম্বিৎ ফিরল। ঠিকই তো, এই কটা দিন ওর কথা একেবারেই ভুলে গিয়েছিল। কিন্তু সময় জানান দিল তৈমুরের অস্তিত্ব। ‘কেমন কাটাচ্ছো ছুটি?’। তৈমুরের প্রশ্নের উত্তরে কি বলবে বুঝে উঠতে পারছিল না সোহান। কারণ তৈমুরকে সত্যিটা সে বলতে চাইছিল না। ‘তৈমুরের সাথে আমি প্রতারণা করেছি, কিভাবে বলব সে কথা’, মনে মনেই বিদ্ধ হল সোহান ।


সবকিছু নিজের ছন্দে চলতে লাগল। শুধুমাত্র সোহান থমকে গিয়েছিল, তার ভাবনাজুড়ে কেবলই তাহসিন।


‘আই এম ফিলিং সিক’, মাকে বলল সোহান। তার মা তাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেল। ডাক্তার চেকআপের পর জানাল, ‘শি ইজ প্রেগনেন্ট’। চমকে উঠল সোহান।


একমাত্র সোহান জানে এই সন্তান তৈমুরের নয়। সোহান মনে মনে ভাবল,’ কি করে বলব এই সন্তান তাহসিনের। মা-বাবা তৈমুরকে অনেকদিন চেনে, বেশ পছন্দও করে। তাদের ধারণা এই সন্তান তৈমুরের’। এই গভীর সত্যটা নিজের মধ্যেই দমিয়ে রাখল সোহান। প্রত্যেকে খুশি ছিল। প্রত্যেকে আনন্দে ছিল। সোহান সবথেকে বেশি খুশি হয়েছিল, কারণ সে তার সন্তানের জন্ম দিতে চলেছে।


‘ আই এম প্রেগনেন্ট, ইউ আর দিস চাইল্ডস ফাদার’, তাহসিনকে ফোনে জানাল সোহান। ভেবেছিল তাহসিন খুশি হবে, তাকে দেখতে চাইবে। কিন্তু না , তা হল না। উলটে সোহানের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দিল।


তৈমুরকে বিয়ে করল সোহান। সে কিন্তু এই সন্তানকে নিজের বলেই মনে করে। তৈমুর যে সোহানকে নিঃশর্ত ভালোবাসে।


‘আমার জীবনের ভালোবাসা কোথায় ? পুরোটা কি মিথ্যে হতে পারে? আমাকে যে ভালোবাসে আমি তার সাথে প্রতারণা করেছি। তৈমুরের সঙ্গে আমি ঠিক করিনি। কী হয়েছে আমার? এই মিথ্যে নিয়ে আমি কিভাবে থাকব? কিভাবে বাঁচব? আমার সন্তান আমার এই মিথ্যাটাকে বারবার জানান দেবে। কিন্তু তার তো কোন দোষ নেই, তার বেঁচে থাকার অধিকার আছে। সারাজীবন আমাকে ভালো থাকার অভিনয় করে যেতে হবে’। সোহানের মনের গভীরে কথাগুলো যেন সমুদ্রের ঢেউয়ের মতনই আছড়ে পড়তে লাগল।


দেবাশিস দে



87 views0 comments
  • download (8)

Copyright © bunonindia. All rights reserved.