মেঘল ঠাকুর-সুস্মিতা দে হাজরা

Updated: Dec 17, 2020

“এতাভিঃ পাহি তনুভিরষ্টাভির্ম্মাং সরস্বতী।।”

“নে এবার শেষ হল পুজো, আর আরতি করলেই হয়ে যাবে। ততক্ষণে দক্ষিণা গুলো সব রেডি করে রাখ। আমাকে আবার এখুনি ঘোষপাড়া ছুটতে হবে।”

“সেকি কাকাবাবু! পুজোর থালাতেই তো দক্ষিণা দেওয়া আছে।”

“মানে? এই পঁচিশ টাকা? এতেই তোর পুজো হয়ে যাবে রে? তবে তো বসন্ত পুরুতকেই ডাকলে পারিস তোরা। মেঘল ঠাকুরের রেট বেশি। সেটা তো জানিস।” এই বলে পুজোর আয়োজন থেকে খানিক সরে পা ছড়িয়ে পিছনে হাত পেতে বসে পড়লেন তিনি। মুখখানা এমন যেন এখন দেবী সরস্বতীর ভাগ্যও তাঁর মর্জির উপর নির্ভর করছে।


এতক্ষণ পুজো শেষ করার যে তৎপর ভাবটা দেখা যাচ্ছিল তেনার মধ্যে, তাও মুহূর্তে উধাও। পাওনাগন্ডার ব্যাপারে খুব নাছোড়। পুজো-অনুষ্ঠানে যে মেঘল ঠাকুরের মতো পুরুত পাশের সাতগ্রামেও পাওয়া যাবে না এব্যাপারে তিনি নিশ্চিত। স্পষ্ট উচ্চারণ, পুঙ্খানুপুঙ্খ বিধিনিয়ম মেনে চলা , দূর্দান্ত ব্যক্তিত্ব আর জুতসই চেহারার এরকম একটা বামুনকে দিয়ে পুজো করিয়ে এইসব মানুষগুলো তাদের পুণ্যের পথ যে চওড়া করে ফেলেছে সেই ভেবে তিনি আত্মসন্তুষ্টির সপ্তমে চড়েই বসে থাকেন।


শ্রীরাধাও এতক্ষণে বুঝে গেছে পঁচিশ টাকাতে আজ আর কাজ হবে না। চোখের ইশারায় রাতুলকে টাকা আনতে ঘরে পাঠিয়ে একবার শেষ চেষ্টা করলো সে।


“শুধু কি প্রণামী কাকাবাবু? আর সাথের চাল, আনাজ, ফলমূলগুলো? ওগুলোর বুঝি দাম নেই?”


"এদের এই ছেঁচড়ামোতে আর পেরে উঠব বলে মনে হচ্ছে না। এরা কি মনে করে পুজো করা খুব সহজ কাজ? যে কেউ করতে পারে? শুধু জন্মগতভাবে ব্রাহ্মণ বলেই সে এই কাজ করে? এতে কোন যোগ্যতাই লাগে না? তা করে দেখান তো একখানা পুজো। শহুরে উকিল নাকি সে!" রাতুলের দিকে তাকিয়ে মনে মনে ভাবল মেঘল ঠাকুর। ঠিক সেইসময়ই রাতুল হাতে ধরা একশোর নোটটা ইশারায় শ্রীরাধা দিকে বাড়িয়ে দিতেই এযাত্রায় কিছু না বলে অপ্রসন্ন মুখ করে নারায়ণকে সালুতে বেঁধে নিতে মন দিলেন তিনি।


শ্রীরাধাও নিজের অসফলতায় খানিক বিরক্ত। আজ সকাল সকাল বামুন বাড়ি গিয়ে পুরুতঠাকুরকে একদম বগলদাবা করে সাথে এনেছিল সে। নাহলে একবার বামুন বেড়িয়ে গেলে বারোটা একটার আগে যে তাকে নাগালে পাওয়া যাবে না সে চিন্তায় বেচারী কাল সারারাত ঘুমাতে পর্যন্ত পারেনি। সে একা হলে তাও হত কিন্তু রাতুলকে সে এতক্ষণ উপোস থাকতে কিছুতেই দিতে পারে না। তার বাড়িতে শ্বশুর-শ্বাশুরী না থাকলে কি হবে? তাঁরা কয়েক বছর হল ইহজগতের মায়া কাটিয়েছেন। তবুও রাতুলকে সে খুব যত্নেই রাখে। নিন্দুকেরা বলে এই পরিবারে যে রাতুলের বিধবা পিসি থাকে তার ভয়েই নাকি শ্রীরাধার এই লক্ষ্মী হয়ে থাকা। যদিও এটা নিন্দুকদের রটনা ছাড়া আর কিছু নয়। সে তার সুদর্শন, নামডাক হওয়া উকিল স্বামীটিকে আসলে খুবই ভালোবাসে।


“কাকাবাবু ব্রাহ্মণের এই সামগ্রীগুলো তাহলে আপনার বাড়িতেই দিয়ে আসি?” এই বলে সে চাল-ফলের রেকাবগুলোর দিকে ইঙ্গিত করে।


মেঘলঠাকুর মনে মনে প্রমাদ গুনছিলেন। মুচকি হেসে তিনিও বলেন,”থাক, মা লক্ষ্মী, ওই চাল তো আমার বাড়িতে কেউ খায়না। আর ফলকলার আজ বাড়িতে ঢেড়। তুমি বরং ওগুলো তোমাদের রাখালকে দিয়ে দাও। ও বাড়ি নিয়ে যাক”।


আর দাঁড়ালেন না তিনি। পিছনেও তাকালেন না। নেহাত এদের ঠাকুরদার আমল থেকেই এবাড়িতে তাঁর পুজো করতে আসা। নচেৎ এই মিত্তির বাড়ির পুজো তিনি কবেই ছেড়ে দিতেন। বরং এখন তিনি যেখানে যাচ্ছেন সেখানে তাঁর খাতির আছে। অশোক ঘোষের বাড়ি। দুখানা ধানকল আর একখান কোল্ডস্টোর। দেদার পয়সা করেছে সে। কিন্তু বাড়িতে তা বলে বিদ্যার আদরও কম নেই। নাহলে এত জাঁক করে সরস্বতীপুজো করতো কি? তার ছোট ছেলেটাও তো কোলকাতাতে কি যেন পড়তে গেছে। বড় দুটোর যদিও সেভাবে হয়নি। ওগুলো বাপের ব্যাবসাতেই ভিড়েছে গিয়ে।


মিত্তিরদের বাড়ি ছাড়িয়ে তেতুঁল ডোবার পাড় দিয়ে যাবার সময় কাকে যেন তিনি চট করে গাছের আঁড়ালে লুকোতে দেখলেন। মুখের আদলের সামান্যই দেখতে পেলেন। কিন্তু তার পাকা চোখকে ফাঁকি দেওয়া মুশকিল! ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসির সাথে সাথেই কোঁচট থেকে একটা বিড়ি বেড়িয়ে এল হাতে। অশোক ঘোষের ছোট ছেলেটা। গাছের আঁড়ালে ছোঁড়াটা মিলিয়ে যেতে যেতে সাথে একখান গোলাপী ওড়নাও যে দেখেছেন তিনি! এই মিত্তিরদেরই মেয়ে। মেজ তরফের।


ওরা যাই করছে তাতে যে মেঘল ঠাকুরেরই মঙ্গল সে কথা স্মরণ করে আরেকবার লম্বা ধোঁয়া মুখ থেকে বার হল তাঁর। বিয়েটাতো তিনিই দেবেন। না হলে শহরে গিয়ে কোন বেজাতে বিয়ে করলে তারই তো একখান পাওনা কম হয়ে যেত। মানিক মিত্তিরটা যেমন ছাপোষা, তেমন কৃপণ। কিন্তু মেয়েটা হয়েছে রূপবতী। এমেয়েকে অশোক ঘোষ বাড়িতে তুলতে বাধ সাধবে বলে মনে হয় না। আর ছেলেটা যদি লেখাপড়া করে দাঁড়িয়ে যায় তাহলে তো দুহাত দিয়ে খরচ করবে অশোক ঘোষ। নিজের দিব্য জ্ঞানে ভবিষ্যত দর্শন করতে করতে যে কখন ঘোষবাড়ির দরজায় পৌঁছে গেছেন সেটা খেয়াল করেননি আর। বাড়ির বাচ্চাগুলোর কলকলিতে তার চমক ভাঙলো। আর মুখ ভরে গেল এক প্রশস্ত দন্তবিকশিত হাসিতে।


পুজো শেষ করে যখন ঠাকুরমশাই উঠলেন তখন বেলা গড়িয়ে মধ্যাহ্নভোজের সময়ও পাড় হয়ে গেছে। এদিকে রান্নার জায়গা থেকে যে সুবাস ছড়িয়েছে তাতে বসে থাকা দায়! কিন্তু তা বলে পুজোতে কোনো গাফিলতি অবশ্যই নয়। তেমন পুরুত এই মেঘল ঠাকুর নয়।


সন্ধ্যায় ঠাকুর যখন তাঁর তাসের আড্ডায় পৌঁছালেন তখন তিনি ছাড়া বাকিরা সবাই সেখানে উপস্থিত। এক প্রস্থ তামাক সেবনের পর শুরু হল খেলা। মেঘল ঠাকুরের মুখে সর্বদাই এক অবজ্ঞা মেশানো আত্ম প্রশান্তির ভাব। তিনি নিজের অবস্থান সম্পর্কে সবসময়ই অধিক মাত্রায় আত্মবিশ্বাসী। তার একমাত্র ছেলে যদিও পুজোআর্চায় একেবারেই আগ্রহী নয়, কিন্তু সে তার নিজের কর্মক্ষেত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত। ঠাকুরের বাড়িতে তাঁর কর্মঠ স্ত্রী, পুত্রবধূ ও একটি ফুটফুটে নাতনি। তাঁর বয়স্কা মাও পঁচাশি বছর বয়সে দিব্য বেঁচে আছেন। ঘরে গাইগরুও আছে কয়েকখান। আরো আছে বেশ কয়েক বিঘা সরস ধানজমি। এর কিছু জমি তো আবার দান হিসেবেই পাওয়া।


শুধু একটাই আক্ষেপ ওই। তার কোনো যথার্থ উত্তরসূরি রইলো না বলে! তিনি জগত ছাড়লে এইসব পাপীতাপী মানুষগুলোর হবে তা কি? এমন ভাব যেন জগতের ভালোমন্দের দায়িত্ব তার উপরই ন্যাস্ত। যদিও তার ভাতুষ্পুত্র নবীনকে নিয়ে আজকাল পূজোআর্চায় বেড়োচ্ছেন ঠাকুর। ইচ্ছা, যদি মোটামুটি ঠিকঠাক মনে করেন তবে একেই দিয়ে যাবেন তার স্থান। যদিও সেটা নাকের বদলে নরুলেরই সামিল প্রায়। অহংকারী মেঘল ঠাকুর তাসের দান দেওয়ার ফাঁকে নিজমনেই হেসে ফেললেন ভাবনাটা মাথায় আসায়। উপড়পাড়ার শিধু পালের ব্যাপারটা নজর এড়ালো না।


এমনিতেই এরা তক্কে তক্কে থাকে মেঘল পুরুতকে একহাত নিতে। ঠাকুরের এই অতিরিক্ত সুখী সুখী ভাবটা তাদের কাছে ভণ্ডামি ছাড়া আর কিছুই মনে হয়না। আবার এই সবাইকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করাটাকে একেবারেই মেনে নিতে পারে না এরা। উপরন্তু এটা কলিকাল। এখন আর শুধু ব্রাহ্মনই সমাজের মাথা এই ভাবনার দাম নেই।


শিধু পাল আজ তাই পুরুত ঠাকুরকে এক হাত নেওয়ার সুযোগ কিছুতেই ছাড়লো না। "ঠাকুর মশায়ের আজ তাহলে ভালই আমদানি হল, নাকি? মনটা বেশ খুশি খুশি! মুখের হাসি থামতেই চাচ্ছে না।"

শিধু পাল জানে আগুন লাগাতে এটুকুই যথেষ্ট।


মেঘল ঠাকুরের ভালো মেজাজটা শেষ পর্যন্ত তাসের আড্ডায় একদম নিম তেঁতো হয়ে গেল।


অন্য দিনের থেকে একটু তারাতারিই বাড়ি ফিরলেন তিনি। এত তারাতারি সচরাচর ফেরেন না তাই বাড়িতেও গিন্নিমার খাবার তৈরি হয়নি তখনও। এই নিয়ে একপ্রস্থ অশান্তির সৃষ্টি হল। তাঁর মনটা আজ সত্যি বেশ খুশি হয়ে ছিল। এমনিতে পুজোপার্বনের দিনগুলোতে পুজাবিধি-যজ্ঞ-আরতি এইসব কিছুই তার মন ভালো করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট হত। একটু খাঁই বেশি বলে দুর্নাম তাঁর ছিল বটে কিন্তু সে তো তাঁর মত উঁচু দরের পুরোহিতের যথাযোগ্য প্রাপ্য বলেই তিনি ঠাউরাতেন।


মনটা ভালো না থাকায় আজ তারাতারি শুতে গেলেন তিনি। অন্যদিন হলে রাতের খাবার খাওয়ার আগে ঘরের দাওয়ায় বসে মা আর গিন্নির সাথে খানিক গল্প করেন, ছোট্ট আদরের নাতনিটিকে নিয়ে খেলা তামাসা করেন, তারপর খেতে বসেন। এমনিতে আজ অনেক কথাও জমা ছিল তাঁর। অশোক ঘোষের বাড়িতে অনেক রকমের ভবিষ্যত পরিকল্পনা হয়েছিল। সবকিছু ঠিকভাবে এগোলে আগামী বছর খানেকের মধ্যে তাঁর বহু সাধের কালী মন্দিরখানার প্রতিষ্ঠা পাওয়ার কথা। অন্তত অশোক ঘোষ তাঁকে সেই রকমই আশা দিয়েছে। এ ছাড়াও অনেক কথা। মা আর গিন্নির সাথে এই সময়টুকুর কথাবার্তা আর ছোট নাতনিটির সাথে খুনসুটি সারাদিনের শেষে তাঁর মন ভালো করে দেয়। কিন্তু আজ তার মেজাজ একেবারেই বিগড়ে গেছে। তাসের আড্ডায় বচসায় সবাই মিলে তাঁকে কোণঠাসা করে ছেড়েছে আজ। নিজের কাছে তিনি নিজেকে যতটা সম্মানীয় বলে মনে করেন, তাঁর পারিপাশ্বির্ক মানুষগুলো সেই সম্মান হানি করতে যেন উঠে পড়ে লেগেছে। এমনকি এইসব দূর্মুখদের পাপপুণ্যের বোধ পর্যন্ত লোপ পেয়েছে। তবেই না কলিকাল!


ঠাকুর বিছানায় শুয়ে এসবই ভেবে যাচ্ছিলেন। তার শরীরটাও আজ একটু খারাপ খারাপ করছিল। অধিক রাতে যখন গিন্নিমা শুতে এলেন তখনও তিনি জেগে। কিন্তু শরীর খারাপের কথা বলার ইচ্ছা তাঁর হল না। এরপর হয়তো একটু তন্দ্রাও এসে গিয়েছিল তাঁর।


গভীর রাতে একটা গোঙানির শব্দে ঘুমটা ভেঙে গেল ব্রাহ্মণ গিন্নির। ঠাকুরের সারা শরীর তখন ঘামে ভিজে একাকার। চিৎকার চেঁচামেচিতে পাড়ার লোকের ঘুমও ভাঙলো। অত রাতে বড় ডাক্তার পাওয়া অসম্ভব তাই পাড়ার হাতুড়েকেই ডেকে আনতে হল। ঠিক হল পরদিন সকালেই শহরের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হবে। ঠাকুরের ছেলেও সকালেই হাসপাতালে পৌঁছে যাবে।


রাত প্রায় কাবার হতে চলল। হাতুড়ে ডাক্তার তখনও নাড়ি ধরে বসে আছেন। মাঝে মাঝে আবার ঝিমাচ্ছেনও। বাড়ির দাওয়াতে দু-একজনের সাথে গিন্নিমা আর ঠাকুরের মা নির্ঘুম চোখে বসে। রাত ফুরানোর প্রতীক্ষায় তারা শুকনো চোখে জ্বালাভাব অনুভব করছে তখন।


ঠাকুরের খুব কাছে বসে একরাশ উৎকন্ঠা মুখে নিয়ে পলকহীন চোখে বসে রয়েছে তাঁরই ভাতুষ্পুত্র নবীন। কাকাকে বড় ভালোবাসে সে! মনেপ্রাণে তাঁকেই গুরু জ্ঞান করে। নেওটার মত আশেপাশে ঘোরে। আজ এক্ষণে তার যে কতটা কষ্টবোধ হচ্ছিল তার আভাস বোধহয় কারুর ছিল না। হঠাৎ কাকার ঠোঁটটা নড়তে দেখে সে বুঝতে পারলো ঠাকুর প্রাণপণে কিছু বলার চেষ্টা করেছেন। ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে দেখলো তিনি প্রায় নিদ্রা গেছেনই বলা চলে। তাই সে কিছুটা দোনোমোনো করে নিজের কানটা ঠাকুরের মুখের কাছে নিয়ে এল। ঠাকুর তখন আর সজ্ঞানে নেই। ঘোরের মাথায় তিনি বলছেন, "বল নবীন বল ….ওঁ দেবতাভ্যঃ পিতৃভ্যশ্চ মহাদোভিগ্য এব চ। নমঃ স্বধায়ৈ স্বাহায়ৈ নিত্যমেব তবস্থিতি…… বল বল বল…. ঠিক করে বল …. নচেৎ এই মেঘল পুরুতের তো অক্ষয় স্বর্গবাস হবে না রে….বল বল ঠিক করে বল"।

13 views0 comments
  • download (8)

Copyright © KolkataPanda.com. All rights reserved.